ঘরের মানচিত্র — কবিতা, জহিরুল ইসলাম

ঘরের মানচিত্র – কবিতা

কবিতা সমগ্র
শেয়ার করুন:
প্রকাশ:

এক

প্রতিটি মানুষের একটা দেশ থাকে,
আর থাকে একটা ঘর — দেশের চেয়েও ছোট, দেশের চেয়েও বড়।
আমার দেশের সীমানা মানচিত্রে আঁকা,
আমার ঘরের সীমানা আঁকা তিনজন মানুষের হাসিতে।

দিনের শেষে দরজার কাছে এসে আমি থমকে দাঁড়াই,
যেমন তীর্থযাত্রী দাঁড়ায় মন্দিরের চৌকাঠে —
ভেতরে তিনটে শব্দ অপেক্ষা করে:
একটা “বাবা!”, আরেকটা “বাবা!”, আর একটা নিঃশব্দ হাসি।
সেই হাসিটার নাম আমি কখনো রাখিনি,
কারণ কিছু কিছু আলোর নাম দিতে নেই।

দুই

আমার ছেলে — আমার হাতের লেখার মতো, একটু বাঁকা, একটু জেদি,
জুতো খুলে রাখে উল্টো করে, প্রশ্ন করে এমন সব কথা
যার উত্তর আমি আজও খুঁজছি।
ওর চোখে আমি দেখি আমার ছোটবেলার মাঠ,
যে মাঠে আমি দৌড়েছিলাম, কিন্তু কোনোদিন জিতিনি —
ও দৌড়োয়, আর আমি প্রথমবার বুঝি, জেতার মানে কী।

আমার মেয়ে — ওর মায়ের মতো, কম বলে, বেশি বোঝে।
ওর ছোট্ট আঙুল যখন আমার আঙুল ধরে,
আমি টের পাই, পৃথিবীর সব সাহস আসলে ওইটুকু হাতের মুঠোয় ধরা।
ও যখন ঘুমের মধ্যে হাসে, আমি ভাবি —
এই হাসিটা বাঁচিয়ে রাখার জন্যই মানুষ সৎ হয়,
এই হাসিটার জন্যই মানুষ ঘরে ফেরে।

তিন

আর সে — যাকে আমি বউ বলি, লোকে বলে স্ত্রী,
কিন্তু আসলে সে এই ঘরের ব্যাকরণ:
তার কথায় আমার বাক্য সম্পূর্ণ হয়,
তার নীরবতায় আমি আমার ভুলগুলো পড়তে শিখি।
সে চায়ের কাপে সকাল আনে, আঁচলে সন্ধ্যা,
আর রাত নামলে দু’টো ছোট মানুষকে বুকে নিয়ে
এমনভাবে ঘুমোয়, যেন পাহারা দিচ্ছে একটা গোটা সভ্যতা।

আমি ভুল করলে সে চুপ করে থাকে — সেই চুপটাই আমার শাস্তি।
আমি ঠিক করলে সে ছেলেমেয়েকে বলে, “দেখ, তোদের বাবা” —
সেই বাক্যটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

চার

লোকে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কী করেন?”
আমি কাজের কথা বলি, পদের কথা বলি, প্রতিষ্ঠানের নাম বলি।
বলি না যে, আমার আসল কাজ —
তিনজন মানুষকে প্রতিদিন নতুন করে ভালোবাসা;
সকালে একবার, রাতে একবার, আর মাঝখানে অগণিতবার,
যতবার মনে পড়ে, ততবার।

আমি জানি, একদিন ছেলেটা নিজের রাস্তা খুঁজে নেবে,
মেয়েটা একদিন অন্য এক বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্য কারো অপেক্ষা করবে,
আর এই দরজায় তখন হয়তো থাকবে শুধু দুটো শব্দ —
আমার পায়ের, আর তার চায়ের কাপের।
তবু আমি নিশ্চিত জানি:
ওরা যেখানেই যাক, ওদের বুকের ভেতর
একটা বারান্দা থেকে যাবে — এই বারান্দাটা।

পাঁচ

তাই আজ, এই সন্ধ্যায়, কোনো ছন্দের তোয়াক্কা না করে লিখে রাখি —
আমার দেশ, আমার ঠিকানা, আমার সমস্ত প্রার্থনা
আর আমার সবচেয়ে বড় অর্জন
মাত্র তিনজন মানুষ:
আমার স্ত্রী, আমার ছেলে, আমার মেয়ে।

পৃথিবীর মানচিত্র বদলায়, সীমানা মুছে যায়, দেশ ভাঙে —
কিন্তু আমার ঘরের মানচিত্র একই থাকে,
কারণ সেটা কাগজে আঁকা নয়,
সেটা আঁকা আছে তিনজোড়া চোখে,
যারা প্রতিদিন সন্ধ্যায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে
আর আমি — ঠিক সেই দিকেই ফিরি।

— জহিরুল ইসলাম

শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার নাম ও মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য যাচাইয়ের পর প্রকাশ করা হবে।