কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: মানুষের জন্য হুমকি, নাকি নতুন সুযোগ?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: মানুষের জন্য হুমকি, নাকি নতুন সুযোগ?

সম্পাদকীয়
শেয়ার করুন:
প্রকাশ:

জহিরুল ইসলাম

একসময় আমরা ভাবতাম, যন্ত্র শুধু মানুষের হাতের কাজ সহজ করবে — ভারী জিনিস তুলবে, দ্রুত হিসাব কষবে, দূরের মানুষের কণ্ঠ কাছে এনে দেবে। আজ সেই যন্ত্র লিখছে, আঁকছে, কথা বলছে, এমনকি সিদ্ধান্ত নিতেও সাহায্য করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয় নয়; এটি আমাদের মোবাইল ফোনে, ব্যাংকে, হাসপাতালে, শ্রেণিকক্ষে এবং খবরের ঘরেও ঢুকে পড়েছে। তাই প্রশ্নটা এখন আর “এআই আসবে কি না” নয়, প্রশ্ন হলো — এই নতুন শক্তি মানুষের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, নাকি নতুন সুযোগের দরজা খুলে দেবে?

মানুষ ও রোবটের হাত — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ছবি: Mohamed Hassan / Wikimedia Commons (CC0)

সুযোগের দিগন্ত

এআই-এর সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হলো জ্ঞান ও সেবাকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আনা। গ্রামের একজন কৃষক মোবাইলে ফসলের পাতার ছবি তুলে রোগ চিনে নিতে পারেন, আবহাওয়ার আগাম বার্তা পেতে পারেন। দূরের কোনো উপজেলায় একজন চিকিৎসক এআই-এর সহায়তায় এক্স-রে বা রিপোর্ট দ্রুত বিশ্লেষণ করে রোগীকে সময়মতো পরামর্শ দিতে পারেন। শিক্ষার্থী নিজের ভাষায়, নিজের গতিতে শেখার সুযোগ পাচ্ছে; যে প্রশ্ন ক্লাসে করতে লজ্জা লাগে, সেটিও সে নিঃসংকোচে জিজ্ঞেস করতে পারছে।

ছোট উদ্যোক্তার জন্যও এআই এক বড় সহায়ক। আগে যে কাজে আলাদা ডিজাইনার, হিসাবরক্ষক বা অনুবাদক লাগত, এখন তার অনেকটাই সাশ্রয়ী খরচে করা সম্ভব। পাংশার মতো মফস্বলের একজন তরুণ ঘরে বসেই বিশ্ববাজারে কাজ করতে পারছেন। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এআই শহর ও গ্রামের, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার দূরত্ব কমাতে পারে।

হুমকির ছায়া

তবে প্রতিটি শক্তিশালী প্রযুক্তির মতো এআই-এরও একটি অন্ধকার দিক আছে। প্রথম আশঙ্কা কর্মসংস্থান নিয়ে। যেসব কাজ একঘেয়ে ও নিয়মমাফিক — ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ হিসাব, কল সেন্টার, এমনকি কিছু ধরনের লেখালেখি — সেগুলোর বড় অংশ যন্ত্র করে ফেলতে পারে। নতুন দক্ষতা না শিখলে অনেক মানুষ পিছিয়ে পড়বেন, আর সেই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে স্বল্পশিক্ষিত ও কম সুযোগপ্রাপ্ত মানুষের ওপর।

দ্বিতীয় বিপদ মিথ্যা ও প্রতারণা। এআই দিয়ে এখন এমন ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর বানানো যায়, যা আসলের মতোই দেখায়। একজন সম্মানিত মানুষের মুখে কখনো-না-বলা কথা বসিয়ে দেওয়া, ভুয়া খবর ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরি করা কিংবা পরিচিত কারও কণ্ঠ নকল করে টাকা চাওয়া — এসব আর কল্পনা নয়। যে সমাজে ডিজিটাল সচেতনতা কম, সেখানে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তা। এআই চলে তথ্যের ওপর; আমরা প্রতিদিন যা লিখি, খুঁজি, কিনি — সবই কোথাও না কোথাও জমা হচ্ছে। এই তথ্য কে ব্যবহার করছে, কীভাবে করছে, তার জবাবদিহি না থাকলে প্রযুক্তি মানুষের সেবক না হয়ে নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি আছে পক্ষপাতের ঝুঁকিও — যে তথ্য দিয়ে যন্ত্রকে শেখানো হয়, তাতে বৈষম্য থাকলে যন্ত্রের সিদ্ধান্তেও সেই বৈষম্য ঢুকে পড়ে।

ভয় নয়, প্রস্তুতি

ইতিহাস বলে, ছাপাখানা, বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট — প্রতিটি বড় পরিবর্তনের শুরুতেই ভয় ছিল। কিছু পেশা হারিয়ে গেছে, আবার নতুন অনেক পেশার জন্ম হয়েছে। যারা পরিবর্তনকে বুঝে নিজেদের প্রস্তুত করেছে, তারাই এগিয়ে গেছে। এআই-এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই প্রযুক্তিকে থামানো যাবে না, কিন্তু একে মানুষের কল্যাণে পরিচালিত করা যাবে।

এর জন্য প্রয়োজন কয়েকটি স্পষ্ট পদক্ষেপ। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থবিদ্যার জায়গায় চিন্তা করার ক্ষমতা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা ও ডিজিটাল দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে — কারণ এগুলোই যন্ত্রের পক্ষে সহজে অনুকরণ করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, যাঁদের কাজ ঝুঁকিতে, তাঁদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও এআই-এর দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য যুগোপযোগী আইন ও নীতিমালা দরকার। চতুর্থত, সাধারণ মানুষকে শেখাতে হবে — চোখে দেখা বা কানে শোনা সবকিছুই সত্য নয়; যাচাই না করে কোনো খবর বা ভিডিও শেয়ার করা উচিত নয়।

শেষ কথা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি হাতিয়ার — ছুরির মতো, যা দিয়ে ফল কাটা যায়, আবার আঘাতও করা যায়। হাতিয়ারটি কতটা ধারালো, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেটি কার হাতে এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। যন্ত্র যত বুদ্ধিমানই হোক, তার মধ্যে মমতা, বিবেক আর দায়বোধ জন্মায় না; সেগুলো মানুষেরই দায়িত্ব। তাই এআই হুমকি হবে নাকি সুযোগ — তা নির্ভর করছে আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর।

আমরা যদি জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতাকে সামনে রেখে এই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করি, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হবে মানুষের সবচেয়ে বড় সহযোগী। আর যদি অজ্ঞতা, লোভ ও উদাসীনতাকে সুযোগ দিই, তবে এই যন্ত্রই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। ভবিষ্যৎ যন্ত্রের হাতে নয় — ভবিষ্যৎ এখনো মানুষেরই হাতে।

লেখক: জহিরুল ইসলাম — গবেষক ও ডেটা বিশেষজ্ঞ।

ছবি: Mohamed Hassan / Wikimedia Commons (CC0)

শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার নাম ও মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য যাচাইয়ের পর প্রকাশ করা হবে।