দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। আর এই শিল্পের প্রাণ লাখো শ্রমিক, যাঁদের বড় অংশ নারী। অথচ যাঁদের হাতে প্রতিদিন বিশ্ববাজারের জন্য পোশাক তৈরি হয়, মাস শেষে তাঁদের অনেকের পক্ষে সংসারের খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। মজুরি বাড়ানোর দাবিতে মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে কয়েক দিন ধরে চলা বিক্ষোভ সেই কষ্টেরই বহিঃপ্রকাশ।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার ১ নভেম্বর পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—তিন পক্ষেরই প্রতিনিধি থাকছেন। ১৯৮৪ সালের পর এটি অষ্টম মজুরি বোর্ড। আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে বোর্ড গঠন সমাধানের শুরু মাত্র; আসল পরীক্ষা হবে বোর্ড কত দ্রুত, কত ন্যায্য ও কত বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত দিতে পারে, তার ওপর।

মজুরি বেড়েছে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত
১৯৮৪ সালে পোশাকশ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ছিল ৬২৭ টাকা। এরপর ১৯৯৪, ২০০৬, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে মজুরি পুনর্নির্ধারিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে প্রবেশস্তরের মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা কার্যকর আছে। কাগজে-কলমে চার দশকে মজুরি প্রায় ২০ গুণ বেড়েছে। কিন্তু খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ যে হারে বেড়েছে, তাতে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। শ্রমিকেরা এখন ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি তুলেছেন—যা বর্তমান মজুরির দ্বিগুণেরও বেশি।
দাবির অঙ্ক নিয়ে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে মতভেদ থাকবেই। কিন্তু একটি বিষয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়: পূর্ণ সময় কাজ করেও যদি একজন শ্রমিক পরিবার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে না পারেন, তাহলে সেই মজুরিকাঠামো টেকসই নয়।
নতুন মজুরি নির্ধারণে যা বিবেচনায় রাখা জরুরি
এক. জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব। মজুরি ঠিক করতে হবে আন্দাজে নয়, বাস্তব হিসাবের ভিত্তিতে। একটি শ্রমিক পরিবারের খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ কত—স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য জরিপের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করে বোর্ডের সামনে প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা উচিত।
দুই. মূল্যস্ফীতির সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়। পাঁচ বছর পরপর বড় আন্দোলনের পর মজুরি বাড়ানোর চক্র ভাঙতে হবে। বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যেন অন্তত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়, সে ব্যবস্থা মজুরিকাঠামোতেই রাখা দরকার। তাহলে প্রতিবার রাস্তায় নামতে হবে না।
তিন. শিল্পের সক্ষমতা ও ছোট কারখানার বাস্তবতা। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় অনেক কারখানা চাপে আছে—এ কথাও সত্য। বড় কারখানা যা পারে, ছোট ও মাঝারি কারখানা সব সময় তা পারে না। তাই মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ঋণ ও নীতিসহায়তার বিষয়েও সরকারকে স্পষ্ট পরিকল্পনা দিতে হবে, যাতে বাড়তি মজুরির কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিকেরাই কাজ না হারান।
চার. বিদেশি ক্রেতাদের দায়। বিশ্বের নামী ব্র্যান্ডগুলো শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির প্রতিশ্রুতি দিলেও পোশাকের দাম সেভাবে বাড়ায় না। বাড়তি মজুরির ভার শুধু মালিকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সমাধান টেকসই হবে না। ন্যায্য মজুরির খরচ পোশাকের দামে প্রতিফলিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর উচিত একসঙ্গে ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করা।
পাঁচ. সব গ্রেডে সামঞ্জস্য। অতীতে দেখা গেছে, নিচের গ্রেডের মজুরি বাড়লেও অভিজ্ঞ শ্রমিকদের গ্রেডে বৈষম্য থেকে গেছে, ফলে ঘোষণার পরও আবার অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালের কাঠামো সংশোধন করতে হয়েছিল এই কারণেই। এবার শুরু থেকেই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মূল্য প্রতিটি গ্রেডে ন্যায্যভাবে প্রতিফলিত হওয়া দরকার।
ছয়. ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন। নতুন মজুরি ঘোষণা হলেই কাজ শেষ নয়। সব কারখানায় তা সময়মতো কার্যকর হচ্ছে কি না, বকেয়া বেতন পড়ে থাকছে কি না—কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরকে তা কঠোরভাবে তদারক করতে হবে। শ্রমিকের অভিযোগ জানানোর সহজ ও নিরাপদ ব্যবস্থাও থাকা চাই।
সাত. দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা। প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়লে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়ে, তাতে বাড়তি মজুরি দেওয়ার সক্ষমতাও তৈরি হয়। মজুরি ও উৎপাদনশীলতাকে প্রতিপক্ষ না ভেবে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা দরকার।
আট. মজুরির বাইরে সামাজিক সুরক্ষা। শুধু নগদ মজুরি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে না। স্বল্পমূল্যে রেশন, শ্রমিকদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, কারখানাভিত্তিক শিশু দিবাযত্নকেন্দ্র ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকের প্রকৃত আয় বাড়বে, মালিকের ওপর চাপও কিছুটা কমবে।
সহিংসতা নয়, সময়বদ্ধ সংলাপ
বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, কারখানা ছুটি ঘোষণা ও উৎপাদন বন্ধ—কোনোটিই কারও জন্য সুখবর নয়। কারখানা বন্ধ থাকলে রপ্তানি চালান পিছিয়ে যায়, ক্রেতার আস্থা কমে, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন শ্রমিকেরাই। শ্রমিকদের প্রতি আমাদের আহ্বান, দাবি আদায়ের আন্দোলন যেন শান্তিপূর্ণ থাকে। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান, ন্যায্য দাবির আন্দোলন সামলাতে যেন সর্বোচ্চ সংযম দেখানো হয়।
মজুরি বোর্ডের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা, তারা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে কাজ শেষ করবে, আলোচনার অগ্রগতি নিয়মিত জনসমক্ষে জানাবে এবং শ্রমিকদের প্রকৃত প্রতিনিধিদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনবে। নতুন মজুরি কার্যকর হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের জন্য অন্তর্বর্তী সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
পাংশা-রাজবাড়ীসহ দেশের নানা প্রান্তের বহু পরিবারের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাই পোশাকশ্রমিকের মজুরি কেবল শিল্পাঞ্চলের বিষয় নয়, এটি গ্রামবাংলার অসংখ্য সংসারের প্রশ্ন। শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে অর্থনীতি এগোবে। ন্যায্য মজুরি তাই দয়া নয়, টেকসই শিল্পের পূর্বশর্ত।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, আল জাজিরা ও রয়টার্স।


